শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

হারানোদিনের ইতিহাস




হারানোদিনের ইতিহাস 

---এস.এম.আশরাফ আলী।


সত্যকথা বলতে কি , বর্তমানে আমাদের এ দেশে হানাফি অনুসারীগণ দু দলে বিভক্ত, যথা - বেরলবি হানাফি এবং দেওবন্দি হানাফি। আমলের মাসলায় উভয়েই এক ও অভিন্ন। কিন্তু আকাইদের মাসলায় বিশেষ করে শানে রিসালাতের ব্যাপারে বেরলবি ও দেওবন্দি আকাইদ ভিন্ন। 


আর এ কথাও আমাদের জেনে রাখতে হবে যে,
একই দীনের বেলায় আমলকে কেন্দ্রকরে কোন ফিরকা সৃষ্টি হয় না, যদি সে আমলের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকে। এজন্যই ইসলামে এযাবত যত ফিরকার সৃষ্টি হয়েছে, সবই আকাইদের নিমিত্তে হয়েছে। হুজুর আকদাসের (দ) বিসাল শরিফের পর থেকে ইসলামের নামে যত ফিরকার সৃষ্টি হয়েছে, তা আকাইদের বিভিন্ন দিককে
কেন্দ্র করে হয়েছে। সেসব ফিরকার মধ্যে কোন একটি ফিরকা শানে রেসালাতের উপর আঘাত করেছে, হুজুর আকদাসের (দ) শানে বিরূপ সমালোচনা করেছে বা হুজুরকে (দ) খাটো করার চেষ্টা করেছে বলে আমাদের জানা নেই। 


হুজুর আকদাসের (দ) ভবিষ্যৎবাণী মুতাবেক একটি ফিরকা যখন থেকে সৃষ্টি হয়েছ, শুধু তখন থেকেই হুজুর আকদাসের (দ) শান-মানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে। এখন থেকে প্রায় দু শ বছর আগে নজদে মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব (লানাতুল্লাহ আলাইহি) এর উদ্ভব হলে, সে সরাসরি হুজুর আকদাসের (দ) বিরুদ্ধে এক নতুন আন্দোলন গড়ে তুলে।যা ইতিহাসের পাতায় "ওয়াহাবী আন্দোলন "নামে খ্যাত । আমাদের এ দেশের অনেক হানাফি ভাইয়েরা তাকে ইসলামি সংস্কারক অর্থাৎ মুজাদ্দিদে ইসলাম বলে আখ্যায়িত করে থাকে। আমি আমার এ লেখায় এই নতুন ফিরকাকে ওয়াহাবী না বলে নজদি নামে আখ্যায়িত করব। সম্মানিত পাঠকবর্গ, পরবর্তিতে এদেরকে নজদি নামে আখ্যায়িত করলে আরও সুন্দর শুনাবে । এখন আসুন, তাদের আকাইদের মূলধারা সম্পর্কে । নজদিদের আকাইদের মূলমন্ত্র হচ্ছে - শানে রেসালাতকে ধূলিস্মাৎ করে দেওয়া। যতসব হারামি কর্ম আছে সবই নজদি মসলকে জায়েজ। তাদের শর্ত হচ্ছে, - যদি কেউ শিরক থেকে বেঁচে থাকে, তবে তার জন্য সবই জায়েজ। নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক। আর শিরকের বেলায় তাদের আকিদা হচ্ছে, - যত ধরণের শিরক আছে, তার মধ্যে বড় শিরিক হচ্ছে নবীর শানকে উচ্চ করা। তাই তারা নবীর শানকে খাটো করছে, নবীকে সর্ব সাধারণের স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে, ঘাটেঘাটে নবীকে বেইজ্জতি করছে, নবীর শানের বিপরীত ইহুদিদের যেসব বর্ণনা সরলতার সুযোগে হাদিসের কিতাবে স্থান পেয়েছে, তা প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করে নবীকে হেয় প্রতিপন্ন করছে। আর এসব হচ্ছে নজদিদের প্রধান হাতিয়ার। 


নজদিদের দ্বিতীয় মূলমন্ত্র হচ্ছে, -- নবীর সেইসব গোলাম যাঁরা নবীর মহান আদর্শে আদর্শবান হয়ে নবীর গোলামির সনদ লাভে ধন্য হয়েছেন অর্থাৎ আউলিয়ে কিরাম,যাঁরা নবীজির (দ) জীবন্ত মুজিজা । সেই আউলিয়ায়ে কিরামের শানে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁদের চরম বিরোধিতা করা। 


নজদিদের তৃতীয় মূলমন্ত্র হচ্ছে -- আহলে বায়আত অর্থাৎ পাক পানজাতনের শানে বেয়াদবি করা, আর তাঁদের নাম নিশানাকে ধরাপৃষ্ঠ থকে চিরতরে মুছে দেওয়া । আর সামনে বাড়তে বাধা গ্রস্ত হচ্ছি।
আমাদের এ উপমহাদেশে নজদিদের বায়ূপ্রবাহ ছিল না। ইসমাইল দেহলবি তা বহন করে নিয়ে এসেছে।এই উপমহাদেশে ইসমাইল দেহলবির বিরুদ্ধে প্রথম যিনি আন্দোলন করেছিলেন তিনি হচ্ছেন -- ইমামে হিকমাত ওয়া কালাম হজরত আল্লামা মোহাম্মদ ফজলে হক খাইরাবাদি (রাহ)।


এ সম্পর্কে তাঁর লিখিত কিতাবের নাম " তাহকিকুল ফতুয়া "। তিনি ইংরেজ শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন বিধায় তাঁকে কালাপানি দ্বিপে আমৃত্যু পর্যন্ত বন্ধি রাখা হয়। তিনি বন্ধিদশায় ইন্তিকাল করেন। তিনি জেলে যাওয়ার পূর্বে সঙ্গে করে কাফনের কাপড় নিয়ে ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে সেই কাফনের কাপড়ে কয়লার দ্বারা আরবি ভাষায় একটি কবিতা লিখেছিলেন। যা ছিল বারগাহে ইলাহি ও দরবারে মুস্তাফায় এক ফরিয়াদ বিশেষ। পরবর্তিতে তা পুস্তিকা আকারে ছাপানো হয়। বাংলা দেশেও তার অনুবাদ বের হয়েছে। বাংলা ভাষায় সেই পুস্তিকার দুটি অনুবাদ আমার নজরে পড়েছে। একটি অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের এবং দ্বিতীয় অনুবাদ সাহিত্যিক মিন্নত আলীর।বইটির নামকরণ " কাফনের লেখা " । 


ইসমাইল দেহলবির মতবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে যিনি গ্রন্থ লিখেছেন তিনি হচ্ছেন - শাইখুল আরিফিন হজরত আল্লামা মাওলানা সৈয়দ মুখলিসুর রহমান জাহাঁগীর কুদ্দিসা সিররুহু ( মির্জাখিল দরবার শরিফ, চট্টগ্রাম)। তিনি গ্রন্থটি লেখেছিলেন ফারসি ভাষায়। তাঁর গ্রন্থের নাম "শারহুস সুদুর ।" তিনি এ গ্রন্থে ইসমাইল দেহলবি ও তার পীরের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এ গ্রন্থে অনেক অজানা তত্ত্ব ও তথ্য রয়েছে। গ্রন্থটি অতীব মূল্যবান। তবে বতর্মানে তা দুষ্প্রাপ্য। তাঁরা উভয়েই ছিলেন ইসমাইল দেহলবির সমসাময়িক। 


পরবর্তিতে বেরলব শরিফ থেকে ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদদিদে জমান আলা হজরত মুফতি ইমাম আহমদ রেজা খান রাহমাতুল্লাহ আলাইহি ইসমাইল দেহলবির নজদি আকিদার বিরুদ্ধে "আল কাওকাবাতুশ শাহবিয়া " নামে অতিমূল্যবান একটি গ্রন্থ লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর দেড় হাজারের ঊর্ধ্বে কিতাব লিখেছেন। তিনি নজদিদের বিরোধী-আন্দোলন সারা পৃথীবিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নজদিদের কোন শাখা-প্রশাখকেই ছাড় দেন নি। তাঁর সময়ে তিনি মুসলিম জাহানে অদ্বিতীয় আলিম বলে পরিগণিত ছিলেন। 
আমরা তাঁর কাছে চির ঋণী। এ ঋণ অপরিশোধ্য। তাঁর প্রতি আমাদের হাজার সালাম। 


নাচিজ --এস.এম. আশরাফ আলী মুনইমি ও আবুল উলায়ি হোসেন নগর, বেলাব, নরসিংদী, বাংলাদেশ।তাং ৮/১২/২০১৬ ইং ।